জাতীয়

তিন মাস পর সৌদি আরব থেকে ফিরল আগুনে নিহত নওগাঁর পাঁচজনের মরদেহ

সৌদি আরবে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশির মরদেহ প্রায় তিন মাস পর দেশে পৌঁছেছে। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি নওগাঁয়, বাকি দুজন নাটোরের বাসিন্দা। শনিবার দুপুরের পর মরদেহগুলো নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। নওগাঁর পাঁচজনের জানাজা ও দাফনও সম্পন্ন হয়েছে।

আজ শনিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে মরদেহ বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে স্বজনেরা অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নিয়ে নওগাঁ ও নাটোরের উদ্দেশে রওনা হন।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় গত ৯ আগস্ট ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি কর্মী নিহত হন। তাঁদের মধ্যে নয়জনের মরদেহ গত ২৭ আগস্ট দেশে পাঠানো হয়েছিল। বাকি সাতজনের মরদেহ ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের পর দেশে পাঠানো হলো।

আগুনে পুড়ে মরদেহগুলো বিকৃত হয়ে যাওয়ায় নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করতে হয়। প্রায় তিন মাস পর পরিচয় নিশ্চিত করে তাঁদের মরদেহ পরিবারের কাছে পাঠানো হয়েছে।

ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া নওগাঁর পাঁচজন হলেন নওগাঁ পৌরসভার পার নওগাঁ এলাকার মো. শাহিন, আত্রাই উপজেলার দুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান, একই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী।

নিহত অপর দুজন হলেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দীঘিরপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ শামীম ও খাজুরা গ্রামের সাব্বির হোসেন।

নওগাঁ পৌরসভার পার নওগাঁ এলাকায় আজ বেলা পৌনে তিনটার দিকে পৌঁছায় নিহত শাহিনের মরদেহ। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বাড়ির বারান্দায় চেয়ারে বসে বিলাপ করছিলেন তাঁর বৃদ্ধ মা নার্গিস বেগম।

আহাজারি করতে করতে তিনি বলেন, ‘হামার ছাওয়াল অনেক আশা করে, সমিতত থ্যাকে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ করে বিদেশ গেছিল। বিদেশ যাইয়ে কামও পাইছিল। সর্বনাশা আগুনে হামার সব শ্যাষ হয়ে গেল। বুকের ধনটা হামাক র‍্যাখে চলে গ্যালো। কিসের আশায়, ক্যামন করে হামরা বাঁচমু।’

সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় চলতি বছরের এপ্রিলে ধারদেনা করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন দুই সন্তানের বাবা শাহিন। দেশটিতে যাওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় কারখানার অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান তিনি।

শাহিনের স্ত্রী মীম বানুও ঘরের ভেতরে আহাজারি করছিলেন। কয়েকজন নারী তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এদিকে বাড়ির সামনের সড়কে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে ভিড় করেন আশপাশের লোকজন। পার নওগাঁ মডেল মসজিদ প্রাঙ্গণে আসরের নামাজের পর জানাজা শেষে স্থানীয় সামাজিক গোরস্তানে শাহিনের মরদেহ দাফন করা হয়।

একই দুর্ঘটনায় নিহত মিনহাজ প্রামাণিকের মরদেহ বিকেল চারটার দিকে আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামে পৌঁছায়। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।

মিনহাজের বাবা আক্কাস প্রামাণিক বলেন, এক বছর আগে সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। দালাল চক্রের মাধ্যমে সৌদি আরবে যাওয়ার পর এক বছরেও মিনহাজের ইকামা হয়নি। মৃত্যুর চার মাস আগে রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় কাজ পান তিনি। কাজ পাওয়ার পর বাড়িতে কিছু টাকাও পাঠিয়েছিলেন।

ঋণের টাকা পরিশোধ করে দেশে ফিরে ঘরবাড়ি তৈরি করার স্বপ্ন ছিল মিনহাজের। কিন্তু ছেলেকে হারিয়ে এখন ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করবেন, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে আক্কাস প্রামাণিকের।

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আত্রাই উপজেলার ১১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে প্রথম দফায় গত ২৭ আগস্ট সাতজনের মরদেহ দেশে আসে। এবার আরও চারজনের মরদেহ দেশে ফিরেছে। বিকেলে মরদেহগুলো তাঁদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে।

ইউএনও আরও বলেন, নিহত ব্যক্তিদের দাফনের জন্য প্রতিটি পরিবারকে আপাতত ৩৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া তিন মাস পর ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে তিন লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে।

নওগাঁর পাঁচজনের মরদেহের জানাজা ও দাফন শনিবার আসর ও মাগরিবের নামাজের পর নিজ নিজ গ্রামে সম্পন্ন হয়েছে।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button